ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকিতে ‘রাঙ্গামাটি’






পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি ভূমিকম্পের বড় ধরণের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য মতে গত পাঁচশো থেকে এক হাজার বছরে এই অঞ্চলে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হয়নি, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিচ্ছে। বড় ধরণের ভূমিকম্প হলে এ অঞ্চলে প্রাণহানির সংখ্যা যেমন বাড়বে তেমনি ক্ষয়-ক্ষতি হবে বহুগুণ।


পুরো জেলাটি পাহাড় ঘেরা, তেমন সমতল ভূমি নেই। এখানকার সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় বাসিন্দারা পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড় কেটে সমান করে অট্টালিকা গড়ে তুলেছে।


বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গামাটির পুরো জেলায় ২০হাজার অধিক সরকারি, বেসরকারি, জনসাধারণের ভবন রয়েছে। অধিকাংশ ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হয়নি। যে কারণে বড় ধরণের ভূমিকম্পের সময় ভবনগুলো এবং ভবনে বসবাসরতরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।



আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানচিত্র এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার অংশবিশেষ দেশের মধ্যে ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা জোন-১-এর আওতায় পড়েছে। এই অঞ্চলটি ডাউকি ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থিত, যা বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।



জানা গেছে, ২০০৩ সালের ৬ আগস্ট ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চল মিজোরাম প্রদেশ ঘেঁষা রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলায় দু’দফায় সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়েছিলো। প্রথমটি সকাল সাড়ে ৬টা এবং দ্বিতীয়টি ১১টা ২০মিনিটে। এটি মাঝারী আকারের ভূমিকম্প ছিলো। যার তীব্রতা ছিলো রেখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৬ এবং এটি প্রায় ৪ সেকেন্ড ধরে স্থায়ী ছিলো। এ ঘটনায় ওই উপজেলার বেশকিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। তবে হতাহতের কোন ঘটনা ঘটেনি।

এরপর একই উপজেলায় ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে ১৮বার ভূকম্পন হয়েছিলো। এর প্রথম দফা ভূমিকম্প ১৩ জানুয়ারি এবং সর্বশেষ ৩০ জানুয়ারি সংঘটিত হয়। ১৩ ও ৩০ জানুয়ারি পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামসহ পার্বত্য তিন জেলায় কয়েক দফা ছোট-বড় ঝাঁকুনি অনুভূত হলেও ওই সময়ের মধ্যে শুধু বরকলেই ১৮ বার ভূকম্পন হয় বলে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানান।

ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যে তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে তার মধ্যে পার্বত্য জেলাগুলোর অবস্থান ১নম্বরে চিহ্নিত হয়েছে। বারবার ভূমিকম্পের কারণে বরকল উপজেলার অধিকাংশ সরকারি স্থাপনার পাকা দালানসহ কয়েকটি উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে ফাটল দেখা দিয়েছিল। এরপর ২০০৯ থেকে ২০১৬ প্রতিবছরই ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। ২০০৯ সালে ২৪বার এবং ২০১০ সালে ২১ বারের বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এরপরও প্রতিবছর ছোট ও মাঝারী ভূমিকম্পে কেঁপেছিল এ অঞ্চল।

ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, ২০০৮সালে ১৩ জানুয়ারি ভোররাতে বরকলে সংঘটিত মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প প্রায় ২৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। ওই সময় তিন দফায় মাঝারি কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী। রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার কাছাকাছি এর উৎপত্তিস্থল হওয়ায় রাঙ্গামাটির মানুষ ভূমিকম্পের মাত্রা অধিক অনুভব করে। ভূমিকম্পের মাত্রাটি ছিল রিখটার স্কেলে ৪.৯।

২০২১ সালের ২৬ নভেম্বর ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো রাঙ্গামাটিতেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। যা কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিলো। এই ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিলো ৬দশমিক ২। ভূকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিলো ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন মিজোরামের কাছে।

এ ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে নির্মিত পুরানবস্তি-ঝুলুইক্যা সংযোগ সেতু এবং তৎসংলগ্ন একটি মসজিদে ফাটল দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ইউনাইটেড নেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি) এর দুই কর্মী এবং একজন স্থানীয়  বাসিন্দাসহ তিনজন আহত হয়েছিলেন।

২০২৪ সালের ২জুন দুপুর ২টা ৪৪মিনিট ৫ সেকেন্ড মিয়ানমারের মাওলাইদ এলাকায় হওয়া ভূমিকম্পে কেঁপেছিল বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা রাঙ্গামাটিও। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫। এর আগে একই বছর ২৯ মে ঢাকা-রাঙ্গামাটিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪।

চলতি বছরের ৩১জুলাই ৮টা ২৬মিনিটে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিলো। ভূমিকম্প জরিপ বিষয়ক ওয়েবসাইট ‌‘ভোলকানো ডিসকভার’ এর তথ্যমতে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের চিন প্রদেশ। রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিলো ৪ দশমিক ৭।

একই বছরের ১ডিসেম্বর দিনগত রাত ১২টা ৫৫মিনিটে রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলা কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। যা কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিলো। আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউরোপিয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি) জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিলো ৪দশমিক ৯ এবং উৎপত্তি স্থল ছিলো মিয়ানমার।

রাঙ্গামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আনোয়ার আল হক বলেন, ভূমিকম্প থেকে বাঁচতে হলে আমাদেরকে ভবন নির্মাণ করার সময় বিল্ডিং কোড মেনে ভবন তৈরি করতে হবে। যেহেতু রাঙ্গামাটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। এ ব্যাপারে ব্যাপক ভাবে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।

রাঙ্গামাটি পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ সুবর্ণ চাকমা বলেন, ২০০৮ সালে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আলোচনা সভায় রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতাল এবং রাঙ্গামাটি ফায়ারসার্ভিস ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো। এরপর এ সংক্রান্ত কোন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।

এ নগর পরিকল্পনাবিদ আরও বলেন, সরকার নতুন আইনে ভবন নির্মাণ অনুমতি নিতে প্রত্যেক জেলায় পৌরসভার মেয়র অথবা প্রশাসককে প্রধান করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে। এ কমিটি ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে কাজ করবেন।

নগর পরিকল্পনাবিদ সুবর্ণ চাকমা জানান, পৌরসভা সর্বোচ্চ ৭০-৭৫ফুট উচ্চতা (৬তলা বিশিষ্ট) ভবন নির্মাণের অনুমতি দিতে পারে। সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করতে হলে জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে। সুউচ্চ ভবন রাঙ্গামাটিতে নেই বলে জানান তিনি। 
 
স্থানীয় সরকার বিভাগ রাঙ্গামাটির উপ-পরিচালক ও রাঙ্গামাটি পৌরসভার প্রশাসক মো. মোবারক হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসন, রাঙ্গামাটি পৌরসভার উদ্যোগে ভূমিকম্প থেকে বাঁচার জন্য সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন সভায় বলা হচ্ছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের পৃথিবী ও পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের ডীন ও বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, পৃথিবীতে এমন কোন বিজ্ঞান আবিষ্কার হয়নি যে ভূমিকম্পের আগাম সংকেত দিতে পারে। যেকোনো স্থানে যেকোনো সময় ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে।
 
ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আরও বলেন, রাঙ্গামাটিসহ পার্বত্যাঞ্চল ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলা যেতে পারে। ছোট-ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের সংকেত। তবে ভূমিকম্প হবে এমন আগাম তথ্য বলা যাবে না, ভূমিকম্প ঠেকানো যাবে না, প্রতিরোধ করা যাবে না; কিন্তু ক্ষয়-ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

উল্লেখ্য চলতি বছরে ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮মিনিটে ৫দশমিক ৭মাত্রা ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিলো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এর উৎপত্তিস্থল ছিলো নরসিংদীর মাধবদীতে। এই ভূমিকম্পে বিভিন্ন ভবনের ফাটল ধরে এবং বিভিন্ন স্থানে ১০জনের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়াও গত ২২, ২৩, ২৬নভেম্বর এবং ৪ ডিসেম্বর দেশে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ